মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলপথের স্বল্প-ব্যবহৃত সুবিধাসমূহ

একটি মালামালের কনটেইনার বা বাক্স চট্রগ্রাম থেকে ঢাকায় পরিবহন করার জন্য রেলপথে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, তার থেকে তিন গুন বেশি খরচ হয় সড়ক পথে পরিবহনের ক্ষেত্রে। তাছাড়াও রেলপথে মালপত্র পরিবহন অপেক্ষাকৃত ভাবে অনেক দ্রুত এবং নিরাপদ। তাই আমাদের সাধারণ বোধ থেকেই বোঝা যায় যে, ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ রেলপথের এই সুযোগ সুবিধাগুলোর সর্বোচ্চ ব্যাবহার করা উচিৎ। কারন ব্যবসায়ীদের কাছে পরিবহন খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং রেলপথ ব্যাবহারে সেই খরচ অনেকাংশেই কমে আসছে। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে এর একদম বিপরীতটা হচ্ছে। বিগত এক দশকে চট্রগ্রাম থেকে ঢাকায় পরিবহন করা হয় এরকম মালামাল বহনকারী কন্টেইনারের সংখ্যা লক্ষণীয় মাত্রায় কমে গিয়েছে। অপরদিকে, এই একই দশকে সড়ক পথে মালামাল বহনকারী কন্টেইনার পরিবহনের সংখ্যা প্রায় তিন গুন বেড়ে গিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা কিছু সমস্যা সনাক্ত করেছে যা তাদেরকে মালামাল পরিবহনের জন্য রেলপথের পরিবর্তে সড়ক পথকেই বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করছে। যদিও, রেলপথের চেয়ে সড়ক পথে খরচ অনেক বেশি। রেলপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বারংবার নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন- মালামাল ঢাকায় পোঁছানোর পর কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি)-তে সেগুলো বের করা এবং সেখান থেকে গন্তব্যস্থলে বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ট্রাক ভাড়া করা ইত্যাদি সবকিছুতেই প্রচুর পরিমানে ভোগান্তি রয়েছে। এছাড়াও, ট্রাকগুলো মালামালের কনটেইনার খুব সহজেই চট্টগ্রামের বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে ঢুকে পরিবহনের জন্য নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু, বাংলাদেশ রেলপথের অধীনে একটি বড় পরিমাপের বন্দর সংলগ্ন জমি থাকলেও, এর নিজস্ব কোনও কনটেইনার ডিপোট নেই।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়ক পথের হাইওয়েগুলো ব্যাবহারে কি কি জটিলতা আছে তা সবাই জানে। যানজটের অবস্থা যখন সবথেকে খারাপ থাকে তখন কনটেইনারগুলো গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা লেগে যায়। বরতমানে চার লেইন এর হাইওয়ে তৈরি করাতে এই যানজটের সমস্যার সমাধান অনেকটাই হয়েছে, যদিও এই চার লেইনের সড়ক এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয় নি। রেলপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে খরচ এতোটাই কম হয় যে, যেকোনো সাধারন মানুষই চিন্তা করবে ব্যবসায়ীদের তাদের ব্যবসার কাজের জন্য এই রেলপথকেই প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। কিন্তু, বস্তুত খরচের চেয়ে পরিবহন সুবিধাগুলোই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যাইহোক, ব্যবসায়ীরা কিন্তু তাদের সকল খরচ বিক্রেতা এবং ভোক্তাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। বাসার দৈনন্দিন কাজের জন্য যেসব পণ্য আমদানি করা হয় বা যেসব পণ্য অন্য কোথাও পাঠানোর কথা এই সব ধরনের জিনিশপত্রের জন্য আগের উক্তিটি সত্যি, যে ব্যবসায়ীরা সকল খরচ বিক্রেতা এবং ভোক্তাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। একদিকে যেমন ভোক্তাদের অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে, অপরদিকে বাংলাদেশের উৎপাদনকারীরা বিশ্ব বাজারে তাদের অবস্থান এবং প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে যার কারন হল ঊর্ধ্বতন উৎপাদন খরচ।

রেলপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা ও ভোগান্তি রয়েছে সেগুলো যদি অপসারণ করা যায়, তাহলে ব্যবসায়ীদের রেলপথে তাদের কার্যক্রম চালানোর জন্য কোনও প্রতিবন্ধকতাই থাকবে না। এটি অনেক দুঃখজনক যে, বাংলাদেশ রেলপথের কেবল মাত্র শতকরা ৫৫ ভাগ কনটেইনারগুলো পরিবহন কাজে ব্যাবহার করা হচ্ছে, যেখানে এই রেলপথই ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বেশি সাশ্রয়ী। বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগ অনেকবারই একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে, যেটি হল চট্টগ্রামে তাদের নিজস্ব কনটেইনার ডিপোট নির্মাণ করা। যত তাড়াতাড়ি প্রস্তাবটি পাস হবে, ততোই এটি বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য উপকারী হবে। তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল কমলাপুর আইসিডি- কে জরুরী ভিত্তিতে একটি বিষয় খেয়াল করা উচিৎ সেটি হল, মালামাল বন্দরে পৌঁছানোর পর ভোক্তা এবং ব্যাবহারকারীদের ভোগান্তি যেন যতটা সম্ভব কম হয়।

বাংলাদেশ আইসিডি ব্যবস্থাপনার খুব জলদি কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ যাতে মালামালের কনটেইনারগুলো খুব দ্রুত ও সহজভাবে নামানো যায়। এছাড়াও তাদের নিজস্ব ট্রাকের বহর বানানো উচিৎ যাতে করে তারা বিক্রেতা বা ভোক্তাদের কাছেও জিনিসপত্র ও মালামাল খুব সহজেই পৌঁছে দিতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলপথ একটি লোকসান খাত হিসেবেই পরিচিতি পাচ্ছে। আর এর পিছনে অনেকাংশেই দায়ী হল অব্যবস্থামূলক কার্যক্রম, অদক্ষতা এবং দুর্নীতি। বাংলাদেশ রেল বিভাগের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হল মালবাহী রেল। বাংলাদেশ রেল বিভাগের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য তাদের উচিৎ এরকম আরও সংশ্লিষ্ট কিছু খাতে তাদের কার্যক্রম জোরদার করা এবং এরই সাথে তাদের ব্যবস্থাপনা বিভাগকে আরও দক্ষ এবং প্রগতিশীল করা।

Tagged with: ,
Postedxxx in বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবেনা। পুরন করা জরুরী *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

জরিপ

ব্যাংকিং খাতের অবস্থা কি ভালো বলে আপনি মনে করেন?

Loading ... Loading ...
ফেসবুক এ আমরা